রক্তাক্ত নাইজার বিমানবন্দর: ফজরের পরেই আল-কায়েদার অতর্কিত হামলা, ১১ সেনাসহ ৩৫ লাশ!
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ফজরের নামাজ শেষ করে মাত্রই ঘরে ফিরেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। চারপাশ তখনো শান্ত। ঠিক তখনই বিকট এক বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল পুরো এলাকা। মুহূর্তের মধ্যে শুরু হলো বৃষ্টির মতো মুহুর্মুহু গুলির শব্দ। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হলো আফ্রিকার দেশ নাইজারের সবচেয়ে বড় এবং সংবেদনশীল বিমানবন্দর ‘দিয়োরি হামানি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) ভোরে রাজধানী নিয়ামেতে অবস্থিত এই বেসামরিক ও সামরিক ঘাঁটিতে চালানো এই অতর্কিত হামলায় হামলাকারীসহ অন্তত ৩৫ জন নিহত হয়েছেন। গত ৫ মাসেরও কম সময়ের মধ্যে এই বিমানবন্দরে এটি দ্বিতীয় বড় হামলার ঘটনা। হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এর দায় স্বীকার করেছে আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পৃক্ত দুর্ধর্ষ জঙ্গি সংগঠন ‘জামাত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল-মুসলিমিন’ (জেএনআইএম)।
ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ ও নিহতের পরিসংখ্যান
নাইজারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে দুই পক্ষেরই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
| বিবরণ | নিহতের সংখ্যা |
| নাইজার সেনা সদস্য | ১১ জন |
| সাধারণ বেসামরিক নাগরিক | ২ জন |
| নিহত হামলাকারী (জঙ্গি) | ২২ জন |
| মোট নিহত | ৩৫ জন |
নিরাপত্তা বাহিনীর পাল্টা আক্রমণে ২২ জন সন্ত্রাসী নিহত হওয়া ছাড়াও ৪ জন আহত হয়েছে এবং অন্তত ২০ জন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
‘ভেবেছিলাম টায়ার ফেটেছে, পরক্ষণেই বুঝলাম নরক নেমে এসেছে’
বিমানবন্দরের ঠিক পাশেই বসবাস করেন লাওয়ালি তসালহা। সেই ভয়ার্ত ভোরের বর্ণনা দিয়ে তিনি বিবিসিকে বলেন:
“আমরা ভোর ৫টা ৫০ মিনিটের দিকে নামাজ শেষ করে বের হই। এর কিছুক্ষণ পরই একটি বিকট শব্দ শুনতে পাই। প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো কোনো গাড়ির টায়ার ফেটে গেছে। কিন্তু পরক্ষণেই যখন অবিরাম গুলির শব্দ শুরু হলো, আমরা বুঝতে পারলাম আসলে কী ভয়ংকর ঘটনা ঘটছে।”
জঙ্গিরা মিশে গেল সাধারণ মানুষের ভিড়ে, লাঠি-দা নিয়ে মাঠে জনতা
সংঘর্ষ থামার পর পুরো বিমানবন্দর এলাকা লকডাউন করে দেওয়া হয়। তল্লাশি অভিযানে নামে সেনাবাহিনী। কিন্তু পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন বেঁচে যাওয়া হামলাকারীরা সাধারণ মানুষের পোশাক পরে স্থানীয় বাসিন্দাদের ভিড়ে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা জানান, “সন্ত্রাসীরা আমাদের মধ্যে মিশে যাওয়ায় তাদের চেনা যাচ্ছিল না। নিজেদের বাঁচাতে এবং সন্দেহভাজনদের প্রতিহত করতে সাধারণ মানুষ লাঠি, সোটা ও দা নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে।” যদিও পরে সেনাবাহিনী আমজনতাকে সহিংসতা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেয়।
নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনাস্থল থেকে বিপুল পরিমাণ আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র উদ্ধার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে আরপিজি-৭ লঞ্চার, একে-৪৭ রাইফেল, হ্যান্ড গ্রেনেড, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক এবং হাজার হাজার তাজা গুলি।
নেপথ্যে ভূ-রাজনীতি: রাশিয়া বনাম ফ্রান্সের ছায়া যুদ্ধ?
এই বিমানবন্দরটি কেবল একটি সাধারণ বেসামরিক বিমানবন্দর নয়, এটি নাইজার, মালি ও বুরকিনা ফাসোর সামরিক জান্তা সরকারের গঠিত ‘সাহেল রাষ্ট্রগুলোর জোট’ (এইএস)-এর একটি অন্যতম প্রধান সামরিক কেন্দ্র।
এর আগে গত জানুয়ারি মাসেও এখানে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) একটি দল হামলা চালিয়েছিল। সেই সময় নাইজারের সামরিক সরকারের প্রধান আবদুরাহমানে তিয়ানি হামলা প্রতিহত করতে সরাসরি রাশিয়াকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে তিনি কোনো প্রমাণ ছাড়াই অভিযোগ করেছিলেন যে, ফ্রান্স, বেনিন ও আইভরি কোস্টের মতো দেশগুলো এই জঙ্গিদের পেছন থেকে মদদ দিচ্ছে। ফলে রবিবারের এই হামলাকে কেবল জঙ্গি হামলা নয়, বরং আফ্রিকার মাটিতে বৈশ্বিক পরাশক্তিদের ছায়া যুদ্ধের অংশ হিসেবেও দেখছেন বিশ্লেষকরা।
আফ্রিকান ইউনিয়ন কমিশনের চেয়ারপারসন মাহমুদ আলী ইউসুফ এই কাপুরুষোচিত হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং সাহসিকতার সঙ্গে বিমানবন্দর ও সামরিক ঘাঁটি রক্ষা করার জন্য নাইজারের নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশংসা করেছেন।
