শত্রুর বদলে যেখানে শুধুই ভালোবাসা! ব্রাজিলের বিপক্ষে হাইতির ঐতিহাসিক ‘যুদ্ধের চেয়েও বড়’ ফুটবল লড়াই

Omni Barta
By -
0

 

শত্রুর বদলে যেখানে শুধুই ভালোবাসা! ব্রাজিলের মুখোমুখি হাইতি: ৯০ মিনিটের ফুটবল নাকি এক অলৌকিক প্রেমকাহিনী?



স্পোর্টস ডেস্ক: ফুটবল মাঠে যখন দুই দল নামে, তখন চলে একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার তুমুল লড়াই। গ্যালারিতে বসে সমর্থকেরা প্রার্থনা করেন প্রতিপক্ষের পরাজয়ের জন্য। কিন্তু ফুটবল বিশ্ব কি এমন কোনো ম্যাচের কথা কল্পনা করতে পারে, যেখানে গ্যালারিতে বসা সমর্থকের এক চোখে থাকবে নিজের দেশের পতাকা, আর মন জুড়ে থাকবে প্রতিপক্ষের প্রতি আজন্ম ভালোবাসা?

হ্যাঁ, এমন এক অভূতপূর্ব এবং আবেগে ভাসানো লড়াই দেখতে যাচ্ছে ফুটবল বিশ্ব। ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর গ্রুপ ‘সি’-এর হাইভোল্টেজ ম্যাচে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ফুটবল পরাশক্তি ব্রাজিল এবং লড়াকু দেশ হাইতি। আগামীকাল বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ছয়টায় অনুষ্ঠিত হবে এই ম্যাচ। ব্রাজিলের জন্য এটি বিশ্বকাপে ‘টিকে থাকার লড়াই’ হলেও হাইতিয়ানদের কাছে এটি নিছক কোনো ম্যাচ নয়, বরং এক টুকরো শৈশবকে ছোঁয়ার এবং নিজেদের প্রথম ভালোবাসাকে আলিঙ্গন করার এক পরম মুহূর্ত।

২০০৪ সালের সেই অলৌকিক জাদুকাঠি: যেদিন থমকে গিয়েছিল অস্ত্রের গর্জন

হাইতি ও ব্রাজিলের ফুটবলের মধ্যকার এই ঐতিহাসিক সম্পর্কের সূচনা আজ থেকে ২২ বছর আগে, ২০০৪ সালে। গ্যাংস্টারদের সহিংসতা ও গৃহযুদ্ধে তখন ক্ষতবিক্ষত ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র হাইতি। বাতাসে প্রতিনিয়ত বারুদের গন্ধ আর অস্ত্রের গর্জন। ঠিক সেই নারকীয় পরিস্থিতির মধ্যে হাইতির রাজধানী পর্তোপ্রিন্সে জাতিসংঘের উদ্যোগে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলতে পা রাখে তৎকালীন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল দল।

রোনালদো, রোনালদিনিও, রবার্তো কার্লোসদের মতো মহাতারকাদের একঝলক দেখতে সেদিন লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল, অনেকে গাছে পর্যন্ত চড়ে বসেছিল। সবচেয়ে অলৌকিক বিষয় ছিল, ব্রাজিলের আগমনে হাইতির সেই রক্তক্ষয়ী গ্যাংওয়ারের সমস্ত বন্দুকের নল দুই দিনের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল! সবাই অস্ত্র নামিয়ে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছিল। ম্যাচটিতে হাইতি ৬-০ গোলে হেরেছিল ঠিকই, কিন্তু তারা পেয়েছিল শান্তির এক দীর্ঘশ্বাস। সেদিনের কথা মনে করে হাইতির প্রবীণ সাংবাদিক পিয়ের রিচার্ড মিদি এখনো রোমাঞ্চিত হন।

৪ দশক পর বিশ্বকাপে হাইতি, কিন্তু প্রতিপক্ষ ‘নিজেদেরই’ ব্রাজিল!

১৯৭৪ সালের পর থেকে দীর্ঘ চার দশক ধরে হাইতি আর কখনো ফুটবল বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায়নি। এই দীর্ঘ সময়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে হাইতির সাধারণ মানুষের কাছে নিজেদের দল হয়ে উঠেছিল হলুদ-সবুজ জার্সির ‘সাম্বার দেশ’ ব্রাজিল। তাছাড়া গত দুই-তিন দশকে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা, মানবিক সাহায্য ও অভিবাসনে ব্রাজিলের ভূমিকা হাইতিয়ানদের মনে সেলেসাওদের প্রতি এক গভীর ভালোবাসার জন্ম দিয়েছে।

দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এবার ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে হাইতি। কাকতালীয়ভাবে, গ্রুপ পর্বে তাদের সঙ্গী হয়েছে সেই প্রিয় দল ব্রাজিল। প্রথম ম্যাচে স্কটল্যান্ডের কাছে ১-০ গোলে হারলেও তীব্র আর্থিক সংকট ও বিদ্যুতের অভাবে ভুগতে থাকা এই দেশটির মানুষের কাছে ফুটবল মানে শুধু স্কোরলাইন নয়, ফুটবল মানে এক বুক বেঁচে থাকার আশা।

‘ওদের দেখতে ঠিক আমাদের মতোই লাগে’

ব্রাজিলের প্রতি হাইতিয়ানদের এই অন্ধ ভালোবাসার কথা প্রকাশ পায় স্থানীয় ফুটবলপ্রেমী জোয়েল জঁ-ব্যাপটিস্টের কথায়। তিনি বলেন, “ব্রাজিলকে আমাদের বন্ধু রাষ্ট্রের মতো মনে হয়, আমাদের সংস্কৃতির সাথেও ওদের দারুণ মিল। মাঠের দিকে তাকালে আমরা এমন সব খেলোয়াড়দের দেখতে পাই, যাদের দেখতে ঠিক আমাদের মতোই লাগে (কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলার)। তারা যখন বিশ্বমঞ্চে দুর্দান্ত সব কীর্তি গড়ে, তখন আমরা নিজেদের গর্বিত মনে করি।”

তাই আগামীকালের ৯০ মিনিটের এই ম্যাচটি শুধু দুই দলের মাঠের লড়াই নয়; এটি জোয়েলের মতো লাখো হাইতিয়ানের জন্য এক অনন্য হৃদয়ের দোলাচল। গ্যালারিতে বসে হাইতিয়ানরা যখন চিৎকার করবেন, তখন এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকবে তাদের মাতৃভূমি হাইতি, আর অন্য পাশে থাকবে আজন্ম লালিত প্রথম ভালোবাসা—ব্রাজিল! ফুটবল ছাড়া আর কোনো খেলায় কি এমন অবিশ্বাস্য আবেগ সম্ভব?

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default